ধানের ব্লাস্ট রোগ ও তার সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা ভূমিকা ধান আমাদের প্রধান খাদ্য শস্য। এর সাথে দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের আবহাওয়া রোগের বিস্তার ও প্রসার লাভের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত ধানে ৩২টি রোগ বিভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন জাতে ও বিভিন্ন এলাকায় লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত পাঁচ ধরনের জীবাণু, যথা: ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, মাইকোপ্লাজমা ও কৃমি দ্বারা ধানের এই সমস্ত রোগ হয়ে থাকে, যার ফলশ্রুতিতে ধানের ফলন হ্রাস পায়। ধানের ব্লাস্ট একটি ছত্রাকজনিত মারাত্মক ক্ষতিকারক রোগ। Pyricularia oryzae (পাইরিকুলারিয়া অরাইজি) নামক এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগটি হয়ে থাকে। সাধারণতঃ বোরো ও আমন মৌসুমে ব্লাস্ট রোগ হয়ে থাকে। অনুকূল আবহাওয়ায় এ রোগের আক্রমণে ফলন শতভাগ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। চারা অবস্থা থেকে শুরু করে ধান পাকার আগ পর্যন্ত যে কোন সময় রোগটি দেখা দিতে পারে। রোগের অনুকূল পরিবেশ দিনের বেলায় গরম (২৫-২৮° সেন্টিগ্রেড) ও রাতে ঠাণ্ডা (২০-২২° সেন্টিগ্রেড) শিশিরে ভেজা দীর্ঘ সকাল অধিক আর্দ্রতা (৮৫% বা তার অধিক) মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ঝড়ো আবহাওয়া এবং গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি এই রোগের আক্রমণের জন্য খুবই অনুকূল। এছাড়া, জমিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেনজনিত সার যেমন- ইউরিয়া ব্যবহার করলে এ রোগ বেশী দেখা যায়। তাছাড়া ভেজা জমির চেয়ে শুকনা জমিতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশী হয়। ব্লাস্ট রোগের জীবাণু ধানের পাতা, গিঁট এবং নেক বা শীষে আক্রমণ করে থাকে। সে অনুযায়ী এ রোগটি পাতা ব্লাস্ট, গিঁট ব্লাস্ট ও নেক বা শীষ ব্লাস্ট নামে পরিচিত। ধানের ব্লাস্ট রোগ চেনার উপায পাতা ব্লাস্ট আক্রান্ত পাতায় প্রথমে ছোট ছোট কালচে বাদামি দাগ দেখা যায়। আস্তে আস্তে দাগগুলো বড় হয়ে মাঝখানটা ধূসর বা সাদা ও কিনারা বাদামি রং ধারণ করে। দাগগুলো একটু লম্বাটে হয় এবং দেখতে অনেকটা চোখের মত। একাধিক দাগ মিশে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরো পাতাটি শুকিয়ে মারা যেতে পারে (চিত্র-১)। গিঁট ব্লাস্ট গিঁট আক্রান্ত হলে আক্রান্ত স্থান কালো ও দুর্বল হয়। প্রবল বাতাসে আক্রান্ত স্থান ভেঙ্গে যেতে পারে, তবে একদম আলাদা হয়ে যায় না (চিত্র-২)। নেক বা শীষ ব্লাস্ট শিশির বা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সময় ধানের ডিগ পাতা ও শীষের গোড়ার সংযুক্ত স্থানে পানি জমে। ফলে উক্ত স্থানে ব্লাস্ট রোগের জীবাণু (স্পোর) আক্রমণ করে কালচে বাদামি দাগ তৈরী করে। পরবর্তীতে আক্রান্ত শীষের গোড়া পঁচে যাওয়ায় গাছের খাবার শীষে যেতে পারে না, ফলে শীষ শুকিয়ে দানা চিটা হয়ে যায় (চিত্র-৩)। দেরিতে আক্রান্ত শীষ ভেঙ্গে যেতে পারে। শীষের গোড়া ছাড়াও যে কোন স্থানে এ রোগের জীবাণু আক্রমণ করতে পারে। ব্লাস্ট রোগের বিস্তার যেভাবে ঘটে ব্লাস্ট রোগের জীবাণু প্রধানত বাতাসের মাধ্যমে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত ছড়ায়। আর যেখানেই অনুকূল পরিবেশ পায় সেখানেই জীবাণু গাছের উপর পড়ে রোগ সৃষ্টি করে। বীজের মাধ্যমে ধানের চারায় রোগটি ছড়াতে পারে, তবে তা পরিমাণে খুবই কম। ধানের ব্লাস্ট রোগ দমনের উপায় প্রাথমিক অবস্থায় নেক ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ সহজে সনাক্ত করা যায় না। সাধারণভাবে যখন জমিতে নেক ব্লাস্ট রোগের উপস্থিতি সনাক্ত করা হয়, তখন জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়। সে সময় অনুমোদিত মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগ করলেও কার্যকরভাবে রোগ দমন করা সম্ভব হয় না। সে জন্য কৃষক ভাইদের আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। রোগ আক্রমণের পূর্বে করণীয় জমিতে জৈব সার প্রকারভেদে বিঘা প্রতি ৫০০-৮০০ কেজি এবং রাসায়নিক সার সুষম মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। যেমন- দীর্ঘ মেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইউরিয়া, ডিএপি/টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও দস্তা যথাক্রমে ৪০, ১৩, ২২, ১৫ ও ১.৫ কেজি, স্বল্প মেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে ইহা যথাক্রমে ৩৫, ১২, ২০, ১৫ ও ১.৫ কেজি হিসাবে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার তিন কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়, তবে ডিএপি সার ব্যবহার করলে বিঘা প্রতি ৫ কেজি ইউরিয়া কম লাগে। পটাশ সার সমান দুই ভাগে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম ভাগ জমি তৈরির সময় এবং ২য় ভাগ শেষ কিস্তি ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগের সময়। সুস্থ এবং রোগমুক্ত ধানের জমি থেকে সংগৃহীত বীজ ব্যবহার করতে হবে। জমিতে একই জাতের ধান চাষ না করে বিভিন্ন জীবনকাল সম্পন্ন জাতের ধান চাষ করা। যেসব জমির ধান নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়নি, অথচ উক্ত এলাকায় রোগের অনুকূল আবহাওয়া (গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘলা আকাশ) বিরাজমান, সেখানকার ধানের জমিতে রোগ হোক বা না হোক, শীষ বের হওয়ার আগ মুহূর্তে প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে ৮ গ্রাম ট্রুপার ৭৫ ডব্লিউপি/দিফা ৭৫ ডব্লিউপি, অথবা ৬ গ্রাম নাটিভো ৭৫ ডব্লিউজি, অথবা ট্রাইসাইক্লাজল/স্ট্রুবিন গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় ১০ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে শেষ বিকালে ৫-৭ দিন অন্তর দু'বার প্রয়োগ করতে হবে। রোগ আক্রমণের পরে করণীয় ব্লাস্ট রোগের প্রাথমিক অবস্থায় জমিতে ১-২ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে পারলে এ রোগের ব্যাপকতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। পাতা ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ব্লাস্ট রোগের প্রাথমিক অবস্থায় প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে ৮ গ্রাম ট্রুপার ৭৫ ডব্লিউপি/দিফা ৭৫ ডব্লিউপি, অথবা ৬ গ্রাম নাটিভো ৭৫ ডব্লিউজি, অথবা ট্রাইসাইক্লাজল/স্ট্রুবিন গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় ১০ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে শেষ বিকালে ৫-৭ দিন অন্তর দু'বার প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ দ্রষ্টব্য: ছত্রাকনাশক ব্যবহারের সময় হাতে রাবার অথবা প্লাস্টিকের গ্লোভস এবং মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন, যাতে রাসায়নিক দ্রব্যাদি শরীরের সংস্পর্শে না আসে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে না পারে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন ০২-৪৯২-৭২০৫৪ (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, ব্রি, গাজীপুর) কয়েকটি জরুরি ফোন নম্বর ও ওয়েবসাইট ০২-৪৯২-৭২০৫-১৪ এক্সন-৩৮৯ (নাগরিক তথ্য সেবা ও সহায়ক কেন্দ্র, ব্রি, গাজীপুর) প্রকাশনায়: উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, ব্রি, গাজীপুর-১৭০১ অর্থায়নে: পরিবর্তিত জলবায়ুতে ব্লাস্ট রোগের সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্প (জিওবি) কপি সংখ্যা: ১০,০০০ | ব্রি প্রকাশনা নম্বর: ২৪৮ | প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০১৮