ধানের ব্লাস্ট রোগ দমনে কৃষকদের করণীয় রোগ পরিচিতি ধানের সবচেয়ে ক্ষতিকর একটি রোগ হল ধানের ব্লাস্ট। এ রোগ এক প্রকার ছত্রাক জীবাণু দ্বারা হয়। এ রোগটি প্রধানত আমন ও বোরো মৌসুমে হয়ে থাকে। আমন মওসুমে প্রধানত সুগন্ধি ধানের জাতে হয়ে থাকে। ধানের চারা অবস্থা হতে শুরু করে বৃদ্ধির সব পর্যায়ে এ রোগটি হতে পারে। আক্রমণের পর্যায় অনুযায়ী এ রোগটি পাতা ব্লাস্ট, গিঁট ব্লাস্ট ও শিষ/নেক ব্লাস্ট নামে পরিচিত। রোগ প্রবণ জাতে এ রোগের আক্রমণে ১০০% পর্যন্ত ফলন নষ্ট হতে পারে। পাতা ব্লাস্ট ব্লাস্ট রোগের জীবাণু পাতায় আক্রমণ করলে প্রথমে সূচালো দাগ দেখা যায় আস্তে আস্তে দাগগুলি বড় হয়ে ডিম্বাকৃতির ছোট ছোট পানি চোষা ধূসর দাগ দেখা যায়। মাঝখানটা ধূসর বা সাদা ও কিনারা বাদামি রং ধারণ করে। দাগগুলি একটু লম্বাটে হয়ে দেখতে অনেকটা চোখের আকৃতির মত দেখায়। রোগাক্রান্ত জাতে একাধিক দাগ মিশে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরো পাতাই শুকিয়ে মারা যায় (চিত্র-১)। গিঁট ব্লাস্ট ব্লাস্ট রোগের জীবাণু যখন গিঁটে আক্রমণ করে তখন গিঁট কালো হয়ে দুর্বল হয়ে যায় ও ভেঙ্গে পড়ে তখন একে গিঁট ব্লাস্ট বলে। এ অবস্থায় আক্রান্ত গিঁটের উপরের অংশ মারা যায় (চিত্র-২)। শিষ ব্লাস্ট বৃষ্টি বা ঘন কুয়াশার জন্য শিশিরে ধানের ডিগ পাতা অথবা শিষের গোড়ার সংযুক্ত স্থানে পানি জমে। যার ফলে উক্ত পানি জমে থাকা স্থানে বাতাসে ভেসে বেড়ানো ব্লাস্ট রোগের জীবাণু উক্ত স্থানে আক্রমণ করে আক্রান্ত স্থান কালচে বাদামি দাগ তৈরি করে। পরবর্তীতে আক্রান্ত শিষের গোড়া হতে উপরের শিষে খাবার পৌঁছাতে না পেরে আক্রান্ত স্থানের উপরের অংশ শুকিয়ে ধানের দানা চিটা হয়ে যায় (চিত্র-৩)। আক্রমণ প্রবল হলে রোগাক্রান্ত জাতে শিষ ভেঙ্গে যেতে পারে। শিষের গোড়া ছাড়া ও শিষের যেকোন স্থানে এ রোগের জীবাণু আক্রমণ করতে পারে। শিষ ব্লাস্ট রোগটি ছড়া মরা হিসাবেও কৃষকের কাছে পরিচিত। রোগ হওয়ার পূর্ব ব্যবস্থাপনা (মূলত শিষ ব্লাস্ট দমনে আগাম করণীয়) পটাশ সার শেষ বার ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের সময় বিঘা প্রতি ৫ কেজি অতিরিক্ত ব্যবহার করা। অতি রোগ প্রবণ এলাকায় মধ্যম মাত্রার ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত ব্রি ধান৭৫ চাষ করা। রোগ হোক বা নাহোক ব্লাস্ট রোগ সংবেদনশীল জাত বিশেষ করে আমন মৌসুমের সকল সুগন্ধি জাতে ও বোরো মৌসুমে প্রায় সব জাতেই শিষ ব্লাস্ট রোগ দমনের জন্য অবশ্যই আগাম ব্যবস্থাপনা নিতে হবে। ধান গাছের থোড় অবস্থায় যদি ব্লাস্ট রোগের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজমান থাকে, তাহলে ঐ এলাকার জমিতে ব্লাস্ট রোগ হোক বা না হোক পুরোপুরি থোড় আসা অর্থাৎ শিষ বের হবার আগ মুহূর্তে একবার ও শিষ বের হবার পর আরেকবার (অর্থাৎ ১ম স্প্রে ৭-১০ দিন পর অর্থাৎ ফুল ফোটা পর্যাপ্ত) মোট দুইবার বিকেলে বেলায় ট্রুপার ৭৫ ডব্লিউপি অথবা অনুমোদনকৃত যেকোন ট্রাইসাইক্লাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক ১ গ্রাম ১ লিটার পানি হারে অর্থাৎ ১৬ লি. পানিতে ১৬ গ্রাম ঔষধ ৮ শতক জমিতে আগাম স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন- জিল/ নাটিভো/ এমিস্টার টপ/ ম্যাকটিভো/ ডিফা/ ইন্দোফিলসবান/ সেলতিমা/ অবিন/ দোলা/ টিগার/ তীর/ সাইরাস/ এল-ক্রাজোলে/ রতন/ ব্রাভো/ পালকি/ ব্রাশিন প্যাকেটের গায়ে নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগ করা যেতে পারে। রোগ আক্রমণের পরে করণীয় (মূলত পাতা ব্লাস্টের ক্ষেত্রে) ব্লাস্ট রোগের প্রাথমিক অবস্থায় জমিতে পানি ধরে রাখা। পাতা ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ব্লাস্ট রোগের প্রাথমিক অবস্থায় উল্লেখিত ছত্রাকনাশকের যেকোন একটি (ট্রাইসাইক্লাজল গ্রুপের হলে ভাল) অনুমোদিত মাত্রায় ৭ দিন অন্তর দুইবার স্প্রে করতে হবে। প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার লাভ ক্ষতির বিশ্লেষণ ব্রি ধান২৮ বিঘায় যদি ১৯ মন হয় ও সর্বনিম্ন ১০৪০ টাকায় মন বিক্রি করলে মোট ১৯৭৬০ টাকা পাওয়া যাবে। আমাদের একটি পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে ৬৩% অর্থাৎ কৃষক ১২ মন ধান (১২৪৮০ টাকা) কম পেয়েছে। কৃষক বিঘাপ্রতি দুইবার (৬৬ গ্রাম+৬৬গ্রাম) স্প্রে করে ৩১৪/- + ৩১৪/-= ৬২৮ টাকা খরচ করে অন্তত ১২৪৮০-৬২৮=১১৮৫২ টাকা ক্ষতি হতে রক্ষা পাবে। এ প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষক ও ধান ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হতে বাঁচতে পারবেন যার ফলে দেশের গড় উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। Citation প্রকাশনা ও অর্থায়নে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কার্যালয়, কুমিল্লা ফোনঃ +৮৮০৮১৬-৩২৩, ই-মেইলঃ brrirscomilla@gmail.com ওয়েবসাইটঃ www.brri.gov.bd সহযোগিতায়: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কুমিল্লা অঞ্চল