আলুর রোগ ও প্রতিকার সংক্রান্ত নথিসমূহ (আপলোডকৃত তিনটি ফাইল থেকে নিষ্কাশিত টেক্সট) নথি ১: ফ্যাক্টশিট (দ্বিতীয় সংস্করণ) — আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ ও তার প্রতিকার রোগের লক্ষণ রোগের আক্রমণে প্রথমে গাছের গোড়ার দিকের পাতায় ছোপ ছোপ ভেজা হালকা সবুজ গোলাকার বা বিভিন্ন আকারের দাগ দেখা যায়, যা দ্রুত কালো রং ধারণ করে পাতা পঁচে যায় এবং পরবর্তীতে গাছ মারা যায়। সকাল বেলা মাঠে গেলে আক্রান্ত পাতার নীচে সাদা পাউডারের মত জীবাণু দেখা যায়। অনুকূল আবহাওয়া নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের (মধ্য কার্তিক থেকে মধ্য ফাল্গুন) যে কোন সময় নিম্ন তাপমাত্রা (রাতে ১০-১৬° এবং দিনে ১৬-২৩° সেলসিয়াস), কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘলা আবহাওয়া ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি এ রোগ বিস্তারে সহায়ক। বাতাস, বৃষ্টিপাত ও সেচের পানির সাহায্যে এ রোগের জীবাণু আক্রান্ত গাছ থেকে সুস্থ গাছে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ নিয়ন্ত্রণের উপায় রোগ হওয়ার পূর্বে করণীয় আলুর মৌসুমে নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রোগের অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধের জন্য ৭ দিন পর পর ম্যানকোজেব গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন—ডাইথেন এম-৪৫ বা ইন্ডোফিল এম-৪৫ বা পেনকোজেব ৮০ ডব্লিউপি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় আক্রান্তের ২-৩ দিনের মধ্যেই এ রোগ মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। রোগ হওয়ার পর করণীয় আক্রান্ত জমিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত সেচ প্রদান বন্ধ রাখতে হবে। নিজের বা পার্শ্ববর্তী ক্ষেতে রোগ দেখা মাত্র ৪/৫ দিন পর পর নিম্নবর্ণিত গ্রুপের যে কোন অনুমোদিত ছত্রাকনাশক বা মিশ্রণ পর্যায়ক্রমে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে: এক্রোবেট এম জেড (ম্যানকোজেব ৬০% + ডাইমেথোমর্ফ ৯%) অথবা কার্জেট এম ৮ (ম্যানকোজেব ৬৪% + সাইমোক্সানিল ৮%) অথবা সিকিউর ৬০০ ডব্লিউজি (ম্যানকোজেব ৫০% + ফেনামিডন ১০%) অথবা মেলোডি ডুও ৬৬.৮ ডব্লিউপি (প্রোপিনেব ৭০% + ইপ্রোভেলিকার্ব) ৪ গ্রাম + সিকিউর ৬০০ ডব্লিউজি ১ গ্রাম। সতর্কতা গাছ ভেজা অবস্থায় জমিতে ছত্রাকনাশক স্প্রে না করাই ভাল। আর যদি স্প্রে করতেই হয় তাহলে অনুমোদিত মাত্রার ছত্রাকনাশকের সাথে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে সাবানের গুড়া মিশিয়ে নিতে হবে। ছত্রাকনাশক স্প্রে করার সময় হাত মোজা, সানগ্লাস, মাস্ক ও এপ্রোন ব্যবহার করতে হবে। সবসময় বাতাসের অনুকূলে স্প্রে করতে হবে। সাধারণ স্প্রেয়ারের পরিবর্তে পাওয়ার স্প্রেয়ার ব্যবহার করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। প্রকাশকাল: ডিসেম্বর, ২০১৮ । অর্থায়নে: কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন, বিএআরসি ক্যাম্পাস, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। নথি ২: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চিঠি ও পরামর্শপত্র সরকারি চিঠি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। স্মারক নং: ১২.১১.০০০০.০১২.৯৯.০০৪.১৮.৮৮৮৬ তারিখ: ২৯/১১/২০২২ বিষয়: আলুর লেইট ব্লাইট এবং টমেটোর ফিউজারিয়াম ও ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট সম্পর্কিত পরামর্শপত্র প্রেরণ প্রসঙ্গে। উপর্যুক্ত বিষয়ের আলোকে জানানো যাচ্ছে যে, আলু এবং টমেটো রবি মৌসুমে গুরুত্বপূর্ণ ফসল। আলুর লেইট ব্লাইট এবং টমেটোর ফিউজারিয়াম ও ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট রোগ মারাত্মক ক্ষতিকর। এ রোগগুলোর আক্রমণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয় সেজন্য উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক উল্লেখিত দুইটি রোগ আক্রমণে করনীয় সংক্রান্ত লিফলেট তৈরী করা হয়েছে। এমতাবস্থায় আলু এবং টমেটোর কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয় সেজন্য অত্র দপ্তর কর্তৃক প্রেরিত লিফলেট দুইটি আপনার অঞ্চলাধীন সকল জেলা, উপজেলায় প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনাকে অনুরোধ করা হলো। সংযুক্ত: পরামর্শপত্র ০২(দুই) ফর্দ। (মোঃ এমদাদ হোসেন সেখ), পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। সংযুক্ত পরামর্শপত্র: আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ ও তার প্রতিকার আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ বিশ্বজুড়ে অন্যতম একটি ক্ষতিকারক রোগ। এ রোগ বাংলাদেশের আলু উৎপাদনের প্রধান অন্তরায়। ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে আলু চাষাবাদ বিস্তারের পাশাপাশি এ রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে প্রতি বছর এ রোগের আক্রমণে আলুর ফলন গড়ে শতকরা ৩০ ভাগ হ্রাস পায়। মড়ক রোগের আক্রমণে ক্ষতির পরিমাণ আলুর জাত, গাছের বয়স, রোগ আক্রমণের সময় ও আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এ রোগের আক্রমণে আলুর ফলন সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হতে পারে। মড়ক রোগ চেনার উপায় এ রোগের আক্রমণে প্রথমে গাছের গোড়ার দিকের পাতায় ছোপ ছোপ ভেজা হালকা সবুজ গোলাকার বা বিভিন্ন আকারের দাগ দেখা যায়, যা দ্রুত কালো রং ধারণ করে এবং পাতা পঁচে যায়। সকাল বেলা মাঠে গেলে আক্রান্ত পাতার নীচে সাদা পাউডারের মত জীবাণু দেখা যায়। ঠান্ডা ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় আক্রান্ত গাছ দ্রুত পঁচে যায়; এই অবস্থায় ২-৩ দিনের মধ্যেই ক্ষেতের সমস্ত গাছ মরে যেতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত আলুর গায়ে বাদামি থেকে কালচে দাগ পড়ে এবং খাবার অযোগ্য হয়ে যায়। রোগ বিস্তারে অনুকূল আবহাওয়া নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের (মধ্য কার্তিক থেকে মধ্য ফাল্গুন) যে কোন সময় নিম্ন তাপমাত্রা (রাতে ১০-১৬° এবং দিনে ১৬-২৩° সেলসিয়াস) এবং কুয়াশাচ্ছন্ন আর্দ্র আবহাওয়া (আর্দ্রতা ৯০% এর বেশী) এ রোগ বিস্তারের জন্য অনুকূল। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার সাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে এ রোগ ২-৩ দিনের মধ্যে মহামারী আকার ধারণ করে। বাতাস, বৃষ্টিপাত ও সেচের পানির সাহায্যে এ রোগের জীবাণু আক্রান্ত গাছ থেকে সুস্থ গাছে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। রোগ হওয়ার পূর্বে করণীয় আগাম আলু চাষ অর্থাৎ ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আলু রোপণ অথবা আগাম জাত চাষের মাধ্যমে এ রোগের মাত্রা অনেকটা কমানো সম্ভব। রোগ সহনশীল জাত যেমন— বারি আলু-৪৬, বারি আলু-৫৩, বারি আলু-৭৭ ইত্যাদি চাষ করা যেতে পারে। এছাড়া রোগমুক্ত প্রত্যায়িত বীজ অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। আলুর মৌসুমে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করতে হবে। আলুর সারি হতে সারির দূরত্ব ৬০ সেমি এবং প্রতি সারিতে আলু হতে আলুর দূরত্ব অন্তত বীজ আলুর ক্ষেত্রে ২৫ সেমি আর কাটা আলুর ক্ষেত্রে ১৫ সেমি অনুসরণ করতে হবে। আলুর সারিতে ভালভাবে মাটি উঁচু করে দিতে হবে। সেচের পর আলু গাছের গোড়ার মাটি সরে গেলে তা মাটি দিয়ে পুনরায় ঢেকে দিতে হবে। নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া ও বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধের জন্য ৭-১০ দিন অন্তর ম্যানকোজেব গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন—ডাইথেন এম-৪৫ বা ইন্ডোফিল এম-৪৫ বা পেনকোজেব ৮০ ডব্লিউপি প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। রোগ হওয়ার পর করণীয় আক্রান্ত জমিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত সেচ প্রদান বন্ধ করতে হবে। নিজের বা পার্শ্ববর্তী ক্ষেতে রোগ দেখা মাত্র ৭ দিন অন্তর নিম্নের যে কোন একটি গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক পর্যায়ক্রমিকভাবে নিম্নবর্ণিত হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে, যেমন— এক্রোবেট এম জেড (ম্যানকোজেব ৬০% + ডাইমেথোমর্ফ ৯%)— ২ গ্রাম অথবা সিকিউর ৬০০ ডব্লিউজি (ম্যানকোজেব ৫০% + ফেনামিডন ১০%)— ২ গ্রাম অথবা মেলোডি ডুও ৬৬.৮ ডব্লিউপি (প্রোপিনেব ৭০% + ইপ্রোভেলিকার্ব)— ২ গ্রাম অথবা জ্যাম্পো ডি এম (এমেটোক্ট্রাডিন ৩০% + ডাইমেথোমর্ফ ২২.৫%)— ২ মিলি অথবা কার্জেট এম ৮ (ম্যানকোজেব ৬৪% + সাইমোক্সানিল ৮%)— ২ গ্রাম অথবা ফুলিমেইন ৬০ ডব্লিউডিপি (ফ্লুমর্ফ ১০% + ম্যানকোজেব ৫০%)— ২ গ্রাম যদি কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া দীর্ঘ সময় বিরাজ করে ও রোগের মাত্রা ব্যাপক হয় সেক্ষেত্রে নিয়োক্ত ছত্রাকনাশকের যে কোন একটি মিশ্রণ পর্যায়ক্রমিকভাবে নিম্নবর্ণিত হারে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ দিন অন্তর স্প্রে করে গাছ ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। এক্রোবেট এম জেড ৪ গ্রাম + সিকিউর ৬০০ ডব্লিউজি ১ গ্রাম অথবা এক্রোবেট এম জেড ৪ গ্রাম + মেলোডি ডুও ৬৬.৮ ডব্লিউপি ১ গ্রাম অথবা ফুলিমেইন ৬০ ডব্লিউডিপি ৪ গ্রাম + অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউডিজি (কার্বেনডাজিম ৫০%) ১ গ্রাম অথবা মেলোডি ডুও ৬৬.৮ ডব্লিউপি ৪ গ্রাম + সিকিউর ৬০০ ডব্লিউজি ১ গ্রাম রোগের প্রাদুর্ভাব খুব বেশী হলে ৩-৪ দিন অন্তর ছত্রাকনাশকের মিশ্রণ স্প্রে করতে হবে। ছত্রাকনাশক পাতার উপরে ও নীচে ভালভাবে স্প্রে করতে হবে। সাধারণ স্প্রেয়ারের পরিবর্তে পাওয়ার স্প্রেয়ার ব্যবহার করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। সতর্কতা গাছ ভেজা অবস্থায় জমিতে ছত্রাকনাশক স্প্রে না করাই ভাল। আর যদি স্প্রে করতেই হয় তাহলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে সাবানের গুড়া মিশিয়ে নিতে হবে। ছত্রাকনাশক স্প্রে করার সময় হাত মোজা, সানগ্লাস, মাস্ক ও এপ্রোন ব্যবহার করতে হবে। সবসময় বাতাসের অনুকূলে স্প্রে করতে হবে। আলুর মড়ক বা নাবী ধ্বসা (লেইট ব্লাইট) রোগ দমন ফাইটপথোরা ইনফেসটেনস নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। প্রথমে পাতা, ডগা ও কান্ডে ছোট দাগ পড়ে। ক্রমে দাগ বড় হয় ও সমগ্র পাতা, ডগা ও কান্ডের কিছু অংশ ঘিরে ফেলে। বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি থাকলে ২-৩ দিনের মধ্যেই জমির অধিকাংশ ফসল আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ভোরের দিকে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মত ছত্রাক চোখে পড়ে। আক্রান্ত ক্ষেতে পোড়া পোড়া গন্ধ পাওয়া যায় এবং মনে হয় যেন জমির ফসল পুড়ে গেছে। প্রতিকার: 1. রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। 2. আক্রান্ত জমিতে সেচ যথাসম্ভব বন্ধ করে দিতে হবে। 3. রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে রিডোমিল (০.২%), ডাইথেন এম-৪৫ (০.২%) ইত্যাদি ছত্রাকনাশক অনুমোদিত হারে ১০-১২ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। আলুর আগাম ধ্বসা বা আর্লি ব্লাইট রোগ দমন অলটারনারিয়া সোলানাই নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। নিচের পাতায় ছোট ছোট বাদামি রংয়ের অল্প বসে-যাওয়া কৌণিক দাগ পড়ে। আক্রান্ত অংশে সামান্য বাদামি এলাকার সাথে পর্যায়ক্রমে কালচে রংয়ের চক্রাকার দাগ অপেক্ষাকৃত লম্বা ধরনের হয়। গাছ হলদে হওয়া, পাতা ঝরে পড়া এবং অকালে গাছ মরে যাওয়া এ রোগের লক্ষণীয় উপসর্গ। আক্রান্ত টিউবারের গায়ে গাঢ় বাদামি থেকে কালচে বসে যাওয়া দাগ পড়ে। প্রতিকার: 1. সুষম সার প্রয়োগ এবং সময়মত সেচ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। 2. রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রোভরাল মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর প্রয়োগ করতে হবে। ডাইথেন এম-৪৫ ০.২% হারে প্রয়োগ করা যায়। 3. আগাম জাতের আলু চাষ করতে হবে। কান্ড ও আলু পচা রোগ স্কেলেরোসিয়াম রলফসি নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। এ রোগের আক্রমণের ফলে বাদামি দাগ কান্ডের গোড়া ছেয়ে ফেলে। গাছ ঢলে পড়ে এবং পাতা, বিশেষ করে নিচের পাতা হলদে হয়ে যায়। আক্রান্ত অংশে বা আশেপাশের মাটিতে ছত্রাকের সাদা জালিকা দেখা যায়। কিছু দিন পর সরিষার দানার মত রোগ জীবাণুর গুটি বা স্কেলেরোসিয়া সৃষ্টি হয়। আলুর গা থেকে পানি বের হয় এবং পচন ধরে। ক্রমে আলু পচে নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিকার: 1. আক্রান্ত গাছ কিছুটা মাটিসহ সরিয়ে ফেলতে হবে। 2. জমি গভীরভাবে চাষ করতে হবে। 3. জমিতে সব সময় পচা জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। আলুর স্টেম ক্যাঙ্কার/স্কার্ফ রোগ দমন রাইজকটোনিয়া সোলানাই নামক ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। গজানো অঙ্কুরের মাথায় এবং স্টোলনে আক্রমণের দাগ দেখা যায়। বড় গাছের গোড়ার দিকে লম্বা লালচে বর্ণের দাগ বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়। কান্ডের সাথে ছোট ছোট টিউবার দেখা যায়। আক্রান্ত টিউবারের গায়ে শক্ত কালচে সুপ্ত রোগ জীবাণুর গুটি দেখা যায়। প্রতিকার: 1. টেরাক্লোর হেক্টরপ্রতি ১৫ কেজি মাত্রায় বীজ লাগানোর পূর্বে বীজনালায় প্রয়োগ করতে হবে। 2. ৩% বরিক এসিড দ্বারা বীজ শোধন বা স্প্রে যন্ত্রের সাহায্যে প্রয়োগ করলেও ভাল ফল পাওয়া যায়। 3. বীজ আলু মাটির বেশি গভীরে রোপণ পরিহার করতে হবে। 4. ভালভাবে অঙ্কুরিত বীজ আলু রোপণ করতে হবে। ঢলে পড়া এবং বাদামি পচন রোগ দমন সিউডোমোনাস সোলানেসিয়ারাম নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। গাছের একটি শাখা বা এক অংশ ঢলে পড়তে পারে। পাতা সাধারণত হলুদ হয় না, সবুজ অবস্থাতেই চুপসে ঢলে পড়ে। গোড়ার দিকে গাছের কান্ড ফেড়ে দেখলে বাদামি আক্রান্ত এলাকা দেখা যায়। ঢলে পড়া গাছ খুব দ্রুত চুপসে যায়। আক্রান্ত আলু কাটলে ভিতরে বাদামি দাগ দেখা যায়। আলুর চোখে সাদা পুঁজের মত দেখা যায় এবং আলু অল্প দিনের মধ্যেই পচে যায়। প্রতিকার: 1. সুস্থ রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। 2. আলু লাগানোর সময় প্রতি হেক্টরে ৮০-৯০ কেজি হারে স্ট্যাবল ব্লিচিং পাউডার জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। 3. পরিমিত মাত্রায় সেচ প্রয়োগ এবং রোগ দেখা দিলে পানি সেচ বন্ধ করতে হবে। আলুর দাদ রোগ স্ট্রেপ্টোমাইসিস স্কেবিজ নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। হালকা দাদ হলে টিউবারের উপরে উঁচু এবং ভাসা বিভিন্ন আকারের বাদামী দাগ পড়ে। রোগের গভীর দাদে গোলাকার গর্ত বা ডাবা দাগ পড়ে। রোগের আক্রমণ সাধারণত ত্বকেই সীমাবদ্ধ থাকে। প্রতিকার: 1. রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। 2. জমিতে বেশি মাত্রায় নাইট্রোজেন সার ব্যবহার বর্জন করতে হবে। 3. ৩% বরিক এসিড দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। 4. জমিতে হেক্টরপ্রতি ১২০ কেজি জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। আলুর পাতা মোড়ানো রোগ দমন এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত পাতা খসখসে, খাড়া ও উপরের দিকে মুড়ে যায়। আগার পাতার রং হালকা সবুজ হয়ে যায় এবং গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। কখনো আক্রান্ত পাতার কিনারা লালচে বেগুনি রংয়ের হয়। গাছ খাটো হয় এবং সোজা হয়ে উপরের দিকে দাঁড়িয়ে থাকে। আলুর সংখ্যা কমে যায় এবং আলু অনেক ছোট হয়। প্রতিকার: 1. রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। 2. কীটনাশক (এজেড্রিন, নোভাক্রন, মেনোড্রিন ইত্যাদি) ২ মিলি অথবা ১ মিলি ডাইমেক্রন প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর জমিতে স্প্রে করতে হবে। 3. আক্রান্ত গাছ টিউবারসহ তুলে ফেলতে হবে। আলুর মোজাইক রোগ দমন পাতায় বিভিন্ন ধরনের ছিটে দাগ পড়ে, পাতা বিকৃত ও ছোট হয়। ভাইরাস এবং আলুর জাতের উপর নির্ভর করে লক্ষণ ভিন্নতর হয়। লতা ঝুলে পড়ে এবং পরবর্তীতে গাছ মারা যায়। প্রতিকার: 1. সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে এবং রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। 2. টমেটো, তামাক এবং কতিপয় সোলানেসি গোত্রভুক্ত আগাছা এ ভাইরাসের বিকল্প পোষক। সুতরাং আশেপাশে এ ধরনের গাছ রাখা যাবে না। আক্রান্ত গাছ আলুসহ রগিং করে ফেলতে হবে। 3. জাব পোকা দমন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, অর্থাৎ ১ মিলি ডাইমেক্রন প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর জমিতে স্প্রে করতে হবে। আলুর হলদে রোগ দমন স্থানীয় জাতের আলুতে এ রোগ বেশি হয়। পাতা কুঁচকে যায় ও ছিটা দাগ দেখা যায়। দূর থেকে আক্রান্ত গাছ সহজেই চোখে পড়ে। আলু ছোট হয় বা একেবারেই হয় না। প্রতিকার: 1. রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। 2. রগিং করে আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে ফেলতে হবে। 3. কীটনাশক প্রয়োগ করে পাতা ফড়িং দমন করতে হবে। এ জন্য ডাইমেক্রন (০.১%) ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। 4. অপেক্ষাকৃত বড় আকারের আলু বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। আলুর শুকনো পচা রোগ দমন ফিউজেরিয়াম প্রজাতির ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। আলুর গায়ে কিছুটা গভীর কালো দাগ পড়ে। আলুর ভিতরে গর্ত হয়ে যায়। প্রথম পচন যদিও ভিজা থাকে, পরে তা শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। আক্রান্ত অংশে গোলাকার ভাঁজ এবং কখনো কখনো ঘোলাটে সাদা ছত্রাক জালিকা দেখা যায়। প্রতিকার: 1. আলু ভালভাবে বাছাই করে সংরক্ষণ করতে হবে। 2. যথাযথ কিউরিং করে আলু গুদামজাত করতে হবে। 3. ডাইথেন এম-৪৫ দ্রবণ ০.২% দ্বারা বীজ আলু শোধন করতে হবে। 4. বস্তা, ঝুড়ি ও গুদামঘর ইত্যাদি ৫% ফরমালিন দিয়ে শোধন করতে হবে। 5. প্রতি কেজিতে ২ গ্রাম হিসেবে টেকটো ২% গুড়া দিয়ে আলু শোধন করতে হবে। আলুর নরম পচা রোগ দমন আরউইনা কেরোটোফেরারা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত অংশের কোষ পচে যায়। পচা আলুতে এক ধরণের উগ্র গন্ধের সৃষ্টি হয়। চাপ দিলে আলু থেকে এক প্রকার দূষিত পানি বেরিয়ে আসে। আক্রান্ত অংশ ঘিয়ে রংয়ের ও নরম হয় যা সহজেই সুস্থ অংশ থেকে আলাদা করা যায়। প্রতিকার: 1. সুস্থ ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। 2. অতিরিক্ত সেচ পরিহার করতে হবে। 3. উচ্চ তাপ এড়ানোর জন্য আগাম চাষ করতে হবে। 4. ভালভাবে বাছাই করে আলু সংরক্ষণ করতে হবে। 5. ১% ব্লিচিং পাউডার অথবা ৩% বরিক এসিডের দ্রবণে টিউবার শোধন করে বীজ আলু সংরক্ষণ করতে হবে। আলুর কাটুই পোকা কাটুই পোকার কীড়া বেশ শক্তিশালী, ৪০-৫০ মিমি লম্বা। পোকার উপর পিঠ কালচে বাদামি বর্ণের, পার্শ্বদেশ কালো রেখাযুক্ত এবং বর্ণ ধূসর সবুজ। শরীর নরম ও তৈলাক্ত। কাটুই পোকার কীড়া চারা গাছ কেটে দেয় এবং আলুতে ছিদ্র করে আলু ফসলের ক্ষতি করে থাকে। পোকার কীড়া দিনের বেলা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে। আলুর কাটা গাছ অনেক সময় কাটা গোড়ার পাশেই পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রতিকার: 1. কাটুই পোকার উপদ্রব খুব বেশি না হলে কাটা আলু গাছ দেখে তার কাছাকাছি মাটি উল্টে পাল্টে কীড়া খুঁজে সংগ্রহ করে মেরে ফেলা উচিত। 2. কাটুই পোকার উপদ্রব খুব বেশি হলে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। প্রতি লিটার পানির সাথে ক্লোরোপাইরিফস (ডারসবান) ২০ ইসি ৫ মিলি হারে মিশিয়ে গাছের গোড়া ও মাটি স্প্রে করে ভিজিয়ে দিতে হবে। আলু লাগানোর ৩০-৪০ দিন পর স্প্রে করতে হবে। আলুর সুতলি পোকা আলুর সুতলি পোকার মথ আকারে ছোট, ঝালরযুক্ত, সরু ডানা বিশিষ্ট ধূসর বাদামি হয়। পূর্ণাঙ্গ কীড়া সাদাটে বা হাল্কা গোলাপী বর্ণের এবং ১৫-২০ মিমি লম্বা হয়ে থাকে। কীড়া আলুর মধ্যে লম্বা সুড়ঙ্গ করে আলুর ক্ষতি করে থাকে। বাংলাদেশে বসতবাড়িতে সংরক্ষিত আলু এ পোকার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রতিকার: 1. বাড়িতে সংরক্ষিত আলু শুকনা বালি, ছাই, তুষ অথবা কাঠের গুড়ার একটি পাতলা স্তর (আলুর উপরে ০.৫ সেমি) দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। 2. আলু সংরক্ষণ করার আগে সুতলি পোকা আক্রান্ত আলু বেছে ফেলে দিতে হবে।